বৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে সংঘদান অন্যতম। ভিক্ষুসংঘকে উদ্দেশ্য করে যে দান প্রদান করা হয় তাকে সংঘদান বলা হয়। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে যে, একজন ভিক্ষুকে দান করার চেয়ে সংঘকে দান করা খুবই ফলদায়ক।

সংঘদান
'চুল্লবর্গ' নামক গ্রন্থে ভিক্ষুসংঘকে দান প্রদানের অন্যতম পুণ্যক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যেকোনো সময় এ দানানুষ্ঠান আয়োজন করা যায়। ভিক্ষু, উপাসক, উপাসিকা যে কেউ একক বা সমবেতভাবে বিহারে বা নিজ গৃহে সংঘদান অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন। সাধারণত উপাসক-উপাসিকাগণ নিজগৃহেই সংঘদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বৌদ্ধরা যেকোনো শুভ কাজ আরম্ভ করার আগে সংঘদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। যেমন: বিবাহ, নতুন ঘর তৈরি, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু, বিদেশ গমন, নবজাতকের অন্নপ্রাশন, প্রব্রজ্যা গ্রহণ প্রভৃতি শুভ কর্মের পূর্বে সংঘদান করা যায়। তবে পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে অবশ্যই সংঘদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে যে, সংঘদানের ফলে মৃত ব্যক্তি সদ্গতি প্রাপ্ত হন। সংঘদান করতে হলে কমপক্ষে পাঁচজন ভিক্ষুর উপস্থিতি প্রয়োজন হয়। সংঘদান অনুষ্ঠানের পূর্বে ভিক্ষুসংঘকে নিমন্ত্রণ করতে হয়। সংঘদানে ভিক্ষুর সংখ্যা যত বেশি হয় তত বেশি ভালো।
সংঘদানে সাধারণত ভিক্ষুসংঘের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দান করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসমূহ হলো: অন্ন, বস্ত্র, ঔষধ, সাবান, তেল, ছাতা, সুঁচ-সুতা ইত্যাদি। সাধারণত ভিক্ষুসংঘ আহার গ্রহণের পূর্বে এ দানকার্য সম্পাদন করা হয়। সংঘদানের সময় ভিক্ষুসংঘের আসনের সামনে দান সামগ্রী সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। ভিক্ষুসংঘ পরিপাটিভাবে আসনে উপবেশন করলে দান অনুষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভকরা হয়। দানকার্য পরিচালনা করার জন্য ভিক্ষুসংঘের মধ্য থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ একজন ভিক্ষুকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সভাপতির অনুমতিক্রমে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভ করা হয়। প্রথমে ত্রিশরণসহ পঞ্চশীল প্রার্থনা করা হয়। তারপর উপস্থিত ভিক্ষুদের প্রধান বা তাঁর নির্দেশে অভিজ্ঞ একজন ভিক্ষু সংঘদান গাথা তিনবার আবৃত্তি করেন। গাথাটি নিম্নরূপ:
'ইমং ভিক্সং সপরিষ্কারং ভিক্ষু সংঘস্স দেম, পূজেম'
বাংলা অনুবাদ: এই প্রয়োজনীয় খাদ্য-দ্রব্য ভিক্ষু সংঘকে দান দিয়ে পূজা করছি।
উপস্থিত সকলে গাথাটি সমস্বরে তিনবার আবৃত্তি করেন। অতঃপর, ভিক্ষুসংঘ সমস্বরে করণীয় মৈত্রী সূত্র, মঙ্গল সূত্র প্রভৃতি পাঠ করেন। তারপর, "ইদং মে ঞাতীনং হোতু, সুখিতা হোন্তু ঞাতযো... নিববাণস পচ্চযো হোতু'তি (এ পুণ্য আমার জ্ঞাতিগণের মঙ্গলের হেতু হোক, জ্ঞাতিগণ সুখী হোক... নির্বাণ লাভের হেতু হোক)' উৎসর্গ গাথাটি তিনবার আবৃত্তি করে সংঘদানের পুণ্যফল জ্ঞাতিগণের উদ্দেশ্যে দান করতে হয়। উৎসর্গ গাথাকে পুণ্যানুমোদন গাথাও বলা হয়। উৎসর্গ গাথা আবৃত্তিকালে দাতা পরিবারের একজন জল ঢেলে পুণ্যরাশি মৃত জ্ঞাতিসহ সকল প্রাণী ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে দান করে। বুদ্ধ সংঘদানের ফল সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যুগে যুগে পৃথিবী, সাগর, মেরু প্রভৃতি ক্ষয় হয়ে যায়। কিন্তু শত সহস্র কল্পেও সংঘদানের ফলে অর্জিত পুণ্যরাশি শেষ হয় না।'
অনুশীলনমূলক কাজ |